প্রত্যহ দিনের ন্যায় আজও
বালকগণ শেষ সময়ে দুই-তিন ধাপ সিঁড়ি বৃহৎ বৃহৎ লম্ফ সহকারে অতিক্রম করিয়া দৌড়াইয়া
অ্যাসেম্বলি হলে প্রবেশ করিয়াছে | সাধারণত লাইনের প্রথমে সবচেয়ে খাটো
দিয়া চালু করিয়া পিছনের দিকে লম্বুদের দিয়া লাইন সমাপ্ত হইয়া থাকে | যদিও এই দেরীর জন্য লাইনের
সেই শৌখিনতার খানিকটা হইলেও বিসর্জন হইয়া থাকে | দুই লম্বুর মাঝে এক-আধজন
খাটো বালক ঢুকিয়া পড়ায় বিক্ষিপ্তভাবে sine কার্ভের সৃষ্টি করিয়া ফেলে | যাহোক প্রার্থনা শুরু হইলে
পর কেহ বেসুরে চিত্কার করিয়া, কেহ বা শক্তি ব্যয় হইবার
ভয়ে গানের সুরে শুধুমাত্র ওষ্ঠ নাড়াইয়ায় ক্ষান্ত থাকে |
এ ব্যাপারখানি শেষ হইলে পর যে
যাহার শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়া চলে এবং ঘন্টা বাজিবার পুর্বমুহুর্ত পর্যন্ত তীব্র
গোলযোগে লিপ্ত হইয়া ওঠে | চক ভাঙ্গিয়া ছোঁড়াছুড়ি করিয়া, কেহ বা কয়েক মুহুর্তের ন্যায় যে
বালক খানিকটা ঘুমাইয়া লইবে বলিয়া স্থির করিয়াছিল , তাহার চেয়ারে সজোরে পদাঘাত
করিয়া তাহার সে অভিপ্রায় প্রায় ক্ষীণতম করিয়া তোলে,কেহ চক দিয়া বোর্ডে কর্কশ আওয়াজ
করিয়া লোকজনকে অতিষ্ঠ করিয়া আনন্দলাভ করিতেছে | অষ্টম শ্রেণীতে মনিটরের
বিশেষ কোনো ভূমিকা নাই | তাহার দায়িত্ব হইলো শুধুমাত্র
ফিজিক্সবাবুর কক্ষ হইতে মুঠা মুঠা চক আনিয়া বালকদিগের খেলার উপকরণের যোগান দেওয়া, আর উপস্থিতির রেকর্ড রাখিবার
খাতাখানি লইয়া আসা |
ইতিমধ্যে warning বেল বাজিয়াছে, ভূগোলবাবু আসিয়া এক চক্কর দিয়া
নিজের কক্ষে ফিরিয়াছেন | তিনি আসিয়া বালকদিগকে উল্লাসে
মাতোয়ারা হইতে দেখিলে প্রথমে অঙ্গভঙ্গি করিয়া তারপর সামান্য বকাবকি করিয়া চলিয়া
যাইতেন | একখানি উদাহরণ দিলে বুঝিতে
কিঞ্চিত সুবিধা হইবে বটে | কোলাহলে রত বালককে দেখিবামাত্র
কাছে ডাকিতেন, তারপর শুধায়তেন "এটা কি করা
হচ্ছিল??" ইতিমধ্যে যাহারা উনার দৃষ্টিগোচর
হয় নাই , তাহারা কেহ শান্ত হইয়া
নিষ্পলক আঁখি মেলিয়া চাহিয়া রহিয়াছে , যেন পুর্বমুহুর্তের ঘটনার সাক্ষী
তারা কোনো অংশেই নয় | বালক মুখ নিচু করিয়া নির্বাক হইয়া
দাড়াইয়া রহিলে পর ভূগোলবাবু নিজের দুই হাত তালুতে তালুতে ঘষিয়া ধুলা ঝাড়িয়া ফেলার
ভঙ্গিমা করিয়া কহিলেন -- "ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানো না??" এইভাবে কিঞ্চিত ভর্ত্সনাপূর্বক
উহাকে শান্ত হইয়া বসার নির্দেশ দিয়া প্রস্থান করিলেন | উনি যাইতেই কেহ আর হাসি
চাপিতে পারে না |
ততক্ষণে আবার ঘন্টা বাজিয়াছে, শিক্ষকমহাশয় আসিয়াছেন | প্রথম পিরিয়ড বাংলা, বাংলাবাবুর ক্লাস | পড়ানো আরম্ভ হইলো, কেহ কেহ ক্লাস নোটস লইবার জন্য কলম
কাগজ বাহির করিয়া প্রস্তুত হইয়াছে | কয়েক মিনিট অতিক্রম হইয়াছে কি হয়
নাই, পাশের শ্রেণীকক্ষে অঙ্কবাবু
তারস্বরে চিত্কার করিতে আরম্ভ করিলেন | আমাদের কক্ষে কয়েক মুহুর্তের জন্য
পড়ানো বন্ধ হইলো | আসলে সকলে ঠাহর করিয়া উঠিতে পারি
নাই যে উনি পড়াইতেছেন নাকি ক্রুদ্ধ হইয়া চিত্কার করিতেছেন | ততক্ষণে চিত্কার ক্রন্দনের
রূপ ধারণ করিয়াছে | উল্টোদিকের কক্ষে ইংরাজিবাবু
বিস্মিত হইয়া ফিসফিস করিয়া কহিলেন, "'Anko' has gone mad." বাংলাবাবু দরজার দিকে চাহিয়াছিলেন | দরজার ফাঁক দিয়া দেখিতে
পাইলাম যে কক্ষ হইতে গোলমালের শব্দ আসিতেছিল প্রধান শিক্ষকমহাশয় সেদিকেই তীব্র
গতিতে ধাবমান হইলেন | তারপর আমাদের কক্ষ হইতে কেবলমাত্র
চরম প্রহার আর "না মহারাজ না" এই আওয়াজই কর্ণগোচর হইতে লাগিল | কয়েক মুহূর্ত পর দুইখানি
আওয়াজই স্তব্ধ হইলো | তারপর যাহার যেমন ক্লাস চলিতেছিল, চলিতে লাগিল | যদিও সকলেই তখন আসল ঘটনা
জানিবার জন্য উদগ্রীব হইয়া বসিয়া আছে | মন আর পড়াশোনায় পড়িয়া নাই | ক্লাস শেষ হইবামাত্র
চারিধার হইতে বালকেরা দঙ্গল বাঁধিয়া সেই কক্ষের সম্মুখে আসিয়া জড়ো হইলো | ইহার পর ঘটনার আসল হেতু
জানা যাইল |
অঙ্কবাবুর প্রথম পিরিয়ডে ক্লাস ছিল | নীলাম্বর নামক বালকটি
ঘুমাইবার চেষ্টা করিতেছিল | শিক্ষকমহাশয় ক্লাসে প্রবেশ
করিবামাত্র শঙ্খদীপ নীলাম্বরকে "নীলু"(আদর করিয়া এই নামেই বালকগণ উহাকে
সম্বোধন করিত) বলিয়া ডাকিয়া উঠিয়াছিল | কিন্তু শিক্ষকমহাশয়ের দ্বিতীয় ইন্দ্রিয়ের
কিঞ্চিত গোলযোগের কারণে "ন"-"ল" সব একাকার হইয়া এবং উহাতে
ধ্বনি পরিবর্তনের কোনো বিধি-বিচার না মানিয়াই খানিক বিকৃত হইয়া অশ্লীল শব্দের
ন্যায় শুনাইয়াছিল | কর্ণপটহের এ অসভ্য আচরণের
বিন্দুমাত্র বিচার-বিশ্লেষণ না করিয়াই ক্রোধে অন্ধ হইয়া শঙ্খদীপকে বেদম প্রহার
আরম্ভ করিলেন | বালকের কপাল মন্দ , প্রধান শিক্ষকমহাশয় ওই
সময়েই ওইখান হইতে ফিরিতেছিলেন | তীব্র গোলযোগ তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ
করায় ছুটিয়া আসিয়া তিনি সাত-পাঁচ না ভাবিয়া বালককে নিজের জিম্মায় লইয়া তীব্রতর
প্রহারে রত হইলেন | "না মহারাজ না"-ও সমান
তালে পাল্লা দিয়া চালু হইলো | এতক্ষণ পর্যন্ত চিত্কার তীব্রতর
ছিল | এখন আঘাতের শব্দ তীব্রতর
হইয়াছে | প্রধান শিক্ষকমহাশয়ের
উত্তরীয় ঘাড় হইতে মেঝেতে পড়িয়া যাইতেছিল, উনি হাতটিকে পিছনে লইয়া
গিয়া এক অদ্ভুত ভঙ্গিমায় তাহাকে ধরিয়া পুনরায় কাঁধে জড়াইলেন, কিন্তু তাতে প্রহার থামে নাই | তাঁহার এই বিচিত্র stunt দেখিয়া সকলে ভীতিপুর্বক
অভিভূত হইয়াছিল | যাহা হউক, এ ঘটনাখানি বালকের চিরকাল স্মরণে
থাকিবে | তবে উক্ত ডাকনামে আর কোনো
বালক ক্লাসে নীলাম্বরকে ডাকার সাহস দেখায় নাই |
No comments:
Post a Comment
পেটে আসছে মুখে আসছে না !! ভাবুন, ভাবুন !