রাবণ বাবাজী ঋষি-মুনির ভেক ধরে এলেন সীতা-হরণে |
- কই হে, কেউ কি
আছেন ?
- অত চেচামেচির কি আছে বাপু, এট্টু
সবুর কর ! দেওর এলে নাকি ?
বাইরে এসে মুনিকে দেখে সীতা একটু নরম সুরে বললেন "বলুন বাবা, কি সেবা করতে পারি আপনার ?"
- (নরম সুরে) আমায় দুটি ভিক্ষা দে মা |
- গরম পরোটা বানিয়েচি | সেই-ই দুটি ভোজন করুন বাবা |
- পরোটা ? সে আবার কি খাদ্য | আমি বরং দুটি ফলাহার করেই তৃপ্ত হই |
- সে কি বাবা ! দুটি খেয়ে দেখুন , ভালো
লাগবে, কোনো সাইড এফেক্ট নেই | আর তাছাড়াও আপনি তো জানেনই "খালি পেতে জল, ভরা পেটে ফল |" আপনি বরং এট্টু পরোটা খেয়ে ফল খাবেন 'খন |
পরোটা এলো | মুনি খেয়ে বললেন "কি অপূর্ব !! তুমি নিজে হাতে বানিয়েচ মা ?"
- হ্যাঁ বাবা | আর একটা দি ?
হাতে সময় কম থাকায় খানদুয়েক পরোটা উদরস্থ করে একখানা ঢেকুর তুলে
ভাবলেন "খাসা জিনিস তো ! আমার দেশে এরম জিনিস আগে তো কই খাইনি | যাক একে
নিয়ে পালালে তো এক ঢিলে দুই পাখি | রামের ওপর প্রতিশোধও হবে , আবার যখন ইচ্ছে পরোটা খাওয়াও হবে | সীতা ফল
নিয়ে রাবণকে দিতে এলে পর "Mauka" বুঝে এক
টানে সীতা কে টেনে নিয়ে পুষ্পকে চড়ে চম্পট | ফলগুলো
ছড়িয়ে পড়ে রইলো এদিকে ওদিকে | চুলোয় যাক ফল |
"পরোটা" হলো বাঙালিয়ানার
ব্রেকফাস্টের থালায় হাত কচলে জিভে জল, আর টিফিন
কৌটোয় স্বস্তির নিশ্বাস | কতো লোক যে পরোটা বেচে খাচ্ছে, এ এক
কুটিরশিল্প মশাই | হাসান-হোসেন যদি পরোটার স্বাদ পেতেন মৃত্যুর আগে জল না চেয়ে পরোটা
চাইতেন | এ হলো
গিয়ে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য | ওই যেমন তাজমহল শত কোটি ভোট পেয়ে পোথম আশ্চর্যে স্থান পেয়ে গেল, খাবারের ভোট হলে নিচ্ছিত জয় হতো পরোটার, তাও আবার খুব বড় ব্যবধানে | কোথায় ধোসা , কোথায় ইডলি , কোথায় Maggi !! কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী যত মঠ তত পন্থা এই পরোটা বানানোর | রবীন্দ্রনাথ
ডাইরেক্টলি পরোটার গান বা কবিতা না লিখে থাকতে পারেন, কিন্তু বহু আবেগ প্রকাশ করেছেন | গীতবিতান
হাতড়ে পাবেন না মশাই | অন্তর থেকে অনুভব করতে হবে | ওই যে "তোমায় নতুন করে পাবো বলে হারাই সারাক্ষণ.." - ভেবে
দেখুন দেখি , পরোটা
ছাড়া কিছু হতেই পারে না | গোটা ভারত ঘুরে কত স্বাদের পরোটাই না খেয়েছেন |এই যেমন ধরুন , পরোটার পেটে আলু, পনির, ডাল যা খুশি ইচ্ছেমতো ঠুসে দিন, পাশবালিশের
মতো বানিয়ে নিন খেতি নেই, কিন্তু
বাটারে একবার জলকাচা মতো করে কেচে নেয়াটা ম্যান্ডেটোরি - এ হলো পাঞ্জাবি পন্থা | অবশ্য এ
ব্যাপারটার কপিরাইট কিন্তু বাঙালিদের | আসল ব্যাপারটা হলো লেড়ো বিস্কুটকে গলা ধরে চায়ে ডুবিয়ে চা খাইয়ে সেই
লেড়োকে খান , এতে চা
খাওয়াও হলো, লেড়ো সত্কার ও হলো | ব্যাস, টুকে
মেরে দিল মশাই , ধরা পড়ার ভয়ে পরোটায় এপলাই করে দিলে |
যাক গে, পরোটার
বংশ কাহিনীও একটু শুনে রাখুন | দুটো কচি ভাই আছে - রুটি আর লুচি | বড় ভাই
পরোটা , দেখতেও
নরম, মনের ভেতরটা একেবারে নারকোলের ফুলটা | ভাইকে
নিয়ে একদম পার্মানেন্টলি ঘাঁটি গেড়েছে নরেন্দ্রপুরে | এবার
জুনিয়রে ফোকাস করি এট্টু | বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে - পরোটা হলো বিদ্বান | আর রুটি
লুচির প্রি-ফিক্সে নরেন্দ্রপুর জুড়ে দিন, চেহারাই
পাল্টে যাবে | নরম মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরী করা আর নরেন্দ্রপুরে ময়দা মেখে রুটি তৈরী , না
প্রসেস না, ফলাফলটা একই | একবার স্টুডেন্ট vs. টিচার টাগ অফ ওয়ার চলাকালীন উত্তেজনার চরমসীমায় পৌঁছে দড়িটা গেল
ছিঁড়ে | কি হবে, কি হবে !! সবার মাথায় হাত | ছেলেদের মাঝখান থেকে প্রস্তাব এলো , জুনিয়র
সেকশনে বলুন দড়ির মত লেচি বানিয়ে রুটির আদলে সেঁকে দিতে | সে দড়ি
ছিড়বে না - "শ্রী দক্ষিণাদিন সাধু ওরফে ভৃগু মহারাজের বশীকরণ মন্ত্র যদি
গ্যারান্টেড হয়, তাহলে এটা হচ্ছে ডবল গ্যারান্টেড | লুচি সে
তো আর এক তান্ডব | ছুঁড়ে দেওয়ালে মারলেই ভেঙ্গে চৌচির | সবাই আদর
করে "নুচি" ডাকলে কি হবে , Marie বিস্কুট ভর্তি ট্রে-তে দিন দুখানা মিশিয়ে , কার
সাধ্যি বিস্কুট আর নুচি আলাদা করে | সব এক, সাইজ-শেপ
আর মুখে দিলেই মুচ মুচ | ডাল-তরকারী চুলোয় যাক |
কান্ডটা হলো পরোটা নিয়েই | ধুপের গন্ধ ছাড়িয়ে প্রতি মঙ্গলবার জুনিয়র সেকশন পরোটার গন্ধে ম-ম নয়, প-প করত | ছেলেরা সপ্তাহে তিনটে জিনিসের অপেক্ষায় থাকত - রোববার, সিনেমা আর 'পরোটা' | আসল জাদুবাদের সাধুবাদ যদিও পরোটার চাখনাকেই দেওয়া উচিত | তেঁতুলের
গা ভেজানো জল দিয়ে সেই আলুর তরকারী বানানো হতো , থুড়ি হয়, সাথে গোলমরিচ গুঁড়ো মেশানো | সে তরকারির জুড়ি নেই | জাপানের টিউব রেলে, আইফেল
টাওয়ারে গবা আছেন, আর সকালে
ব্রেকফাস্টে চিনি বা আলুর দম দিয়ে পরোটা চিবোতে গিয়ে আছে সেই আলুর তরকারির আক্ষেপ | বড় ছুটির
কোনো একটার আগে শেষ শনিবারের ডিনারে থাকত পরোটা মাংস | সকাল
থেকে উপোস , রাতে
সবাই সবাইকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিত "কে কতগুলো খেতে পারে !" তপনদা অবশ্য
অনেককে হারিয়ে দিতেন |
আমাদের এক "বুরদা" ছিলেন, সম্রাটদা
বলে ডাকতেম | এক্কেবারে
গন্ধে গন্ধে হাজির বলতে যা বোঝায় , সেরকম মানুষ ছিলেন | "ছিলেন" কেন বলছি সেটা
পরে বুঝতে পারবেন | স্টাডি হলে একজন স্যার বা "বুরদা"(বড় দাদা) থাকাটা আবশ্যক
ছিল | স্টাডি
হলে গার্ড দেওয়ার নামে পরোটা খেতে আসাটা তাঁর আবশ্যক ছিল , সে
বৃষ্টি নামুক কি হাড়কাঁপানো শীতের দিন হোক | তা সেদিন
তেঁতুল না থাকায় পরোটা আলুর দম হয়নি | তাই ব্রেকফাস্টে রুটি-তরকা | নিয়মমাফিক স্টাডি হল শেষ হওয়ার ২ মিনিট আগেই বেরিয়ে গিয়ে ঠোঁট চাটতে
চাটতে সোজা ডাইনিং হল | পরোটায় পাপ, পাপে চাপ | যা হওয়ার
তাই হলো | সম্রাট
হয়ে গেলেন অভিমন্যু | চক্রব্যুহে ঢুকে পড়লেন, পালাবার
পথের কথা ভাবার আগেই ভবনের মহারাজ "কী হে, আরে এসো
এসো" বলে আদর আপ্যায়ণ করে ডেকে খেতে বসালেন |
- আজ পরোটা হয়নি কিন্তু, যা হয়েছে
একটু খেয়ে যাও |
এহে , কি ভুলটাই না হয়েছে ! দুটো রুটি - তরকা নাহয় ঠিক ছিল , কিন্তু
পরোটা দুটোর জাগায় তিনখান, আর রুটি
দুখান খাব বললেই হলো ! মহারাজ "আরে এইটুকু খাবে নাকি, এখনি তো খাওয়ার সময়" বলে আর একখান রুটি চাপিয়ে দিলেন | বুরদার
দুপাটি দাঁত রুটি নিয়ে টাগ অফ ওয়ার খেলছে , আমরা
নীরব দর্শক | মনে মনে
আমরা তখন খুশিতে ডগমগ | এক্সট্রা পরোটা দিতে দেখলে যতখানি কষ্ট হত, আজ আনন্দটা ১৩ লক্ষ গুণ বেড়ে গিয়ে মুখে হাজার ওয়াটের শয়তানি হাসি
ফুটে উঠলো | পরের
মঙ্গলবার থেকে তিনটে করে পরোটা বেঁচে যেত | এই হলো
"ছিলেন" এর কারণ |
আমরা পরোটা বলতে শুধু সুন্দর-ই বুঝি , আর
সম্রাটদা বুঝেছিলেন সুন্দর নয়, ভয়ঙ্কর
সুন্দর |
বিশেষ খবর : নরেন্দ্রপুর রিট্রিটে ব্রেকফাস্টে পরোটা-গোলমরিচ দেওয়া
আলুর দম | একদম মিস
করবেন না | পারলে
ঠাকুরদার থেকে হাতে ধরে শিখে নিন এই রেসিপি, কাউকে
ইমপ্রেস করতে হলে এর জুড়ি নেই |
বস হোক বা বউ
কিম্বা অন্য কেউ |